শনিবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, রাত ৪:৩১

নুসরাত হত্যায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ খুনির ফাঁসির আদেশ

নুসরাত হত্যায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ খুনির ফাঁসির আদেশ

dynamic-sidebar

অনলাইন ডেস্ক : ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ খুনির সবার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।

 

আজ বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ বেলা সোয়া ১১টার দিকে সব আসামির উপস্থিতিতে এ রায় দেন। এর আগে বেলা ১১টা ৭ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতের এজলাসে এসে হাজির হন বিচারক। তিনি সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন।

 

এর আগে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ফেনী জেলা কারাগার থেকে মামলার ১৬ আসামির সবাইকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পিনপতন নীরবতার মধ্যে বিচারক রায়ের কাজ শুরু করেন।

মামলার রায় শুনতে আদালতে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও মামলার আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও আসামিদের স্বজনরাও হাজির হয়েছেন। আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি প্রিজনভ্যানে করে আসামিদের কারাগার থেকে বের করা হয়। ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে তাদের আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়। প্রিজনভ্যানটিকে মাঝখানে রেখে দুইপাশে ছিল পুলিশের গাড়ি। তারপর হাতকড়া পরা অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে সবাইকে প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। কাঠগড়ায় আসামিদের উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছিল। কামরুন নাহার মনি তাঁর সদ্যজাত সন্তানকে নিয়েই কাঠগড়ায় উপস্থিত হয়েছেন। আসামিরা দোয়া পড়ছিলেন।

চাঞ্চল্যকর এই রায়েকে ঘিরে ফেনী শহর, আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নুসরাতের বাড়ি ঘিরেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এ মামলায় উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর। তারপরই আদালত রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন। মামলার বিচারকাজ শুরুর ৬২ দিনের মধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়।

মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এসব আসামির সবাই কারাগারে আছেন। আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি, প্রভাবশালী কাউন্সিলর, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কর্মী থেকে শুরু করে মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছেন।

মামলার রায়কে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তাই ফেনী শহর, আদালত চত্বর ও নুসরাতের বাড়িতে কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে বলে সকালে বলেন ফেনী পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সুদীপ্ত রায়।

 

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘নুসরাতের বাড়িতে এক সার্কেল পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। অন্যদিকে আদালত চত্বরে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতাধিক সদস্য। এ ছাড়া জেলা শহরেও র‍্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সাদা পোশাকেও বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’

সুদীপ্ত রায় আরো বলেন, এই মামলার সব আসামিই ফেনী জেলা কারাগারে আটক আছেন। বিচারকের অনুমতি নিয়ে সকাল ১০টার দিকে সব আসামিকে আদালতে নিয়ে আসা হবে।

এদিকে আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আদালত চত্বরে দেখা যায়, চত্বরজুড়েই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। সাধারণ মানুষকে খুব একটা দেখা যায়নি তখন পর্যন্ত। তবে মামলার বিচারের কাজে সংশ্লিষ্ট যাঁরা আসছেন, তাঁদের তল্লাশি করে করে পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন।

এ ছাড়া ঢাকা থেকে প্রায় সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আজ ফেনী জেলা আদালত চত্বরে অবস্থান নিয়েছেন, রয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও।

নুসরাত হত্যার নেপথ্যে

মামলার বিবরণে জানা যায়, ফেনী সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলীম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে চলতি বছরের ২৬ মার্চ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁর অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ মামলায় গত ২৭ মার্চ পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে।

সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশে মাকসুদ কমিশনার, শাহাদাত হোসেন শামীম তাঁদের অনুসারীদের নিয়ে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে সোনাগাজী বাজারে মানববন্ধন করে এবং থানা ঘেরাও করার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে সিরাজ-উদ-দৌলার অনুসারীরা নুসরাতকে মামলাটি উঠিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু নুসরাত মামলা উঠিয়ে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

পরে গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত আলিমের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে দুর্বৃত্তরা তাকে ডেকে কৌশলে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। পরে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীদগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ দিন পর ১০ এপ্রিল রাতে মারা যায়।

পরদিন ১১ এপ্রিল বিকেলে সোনাগাজীতে জানাজা শেষে নুসরাতকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল নুসরাতকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। পরে সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।

নুসরাতের ওপর হামলার ঘটনায় ফেনী, সোনাগাজীসহ সারা দেশের মানুষ ফুঁসে ওঠে। মশাল মিছিল, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল করে দোষীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে।

তবে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, থানা পুলিশ, কয়েকজন সুবিধাভোগী সাংবাদিক মরিয়া হয়ে অপপ্রচার চালাতে থাকে। সে সময়ের জেলা পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের পক্ষে সাফাই গেয়ে নুসরাত আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন দেয়।

এ প্রতিবেদনের কারণে পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে ফেনী থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকা পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সময়ে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। এর আগে গত ২৭ মে নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাতকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেনস্তা করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিও প্রচারের এ ঘটনায় আইসিটি আইনে মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

পরে এ মামলা তদন্ত করার জন্য পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষে গত ২৯ মে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনের আদালতে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দেন নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলম।

এ মামলায় আটক থাকা চার্জশিটের বাইরের পাঁচজনকে বিচারিক আদালত মামলার দায় থেকে অব্যহতি দেন। তাঁরা হলেন কেফায়েত উল্লা, আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, সাইদুল ইসলাম ও আলাউদ্দিন।

অভিযোগপত্রভুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। এর পর ২৭ ও ৩০ জুন মামলার বাদী ও নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। এর পর মোট ৯২ সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত।

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All rights reserved © 2018 DailykhoborBarisal24.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net

%d bloggers like this: